হেমন্তকালীন জোছনা-২০২২
ডাব গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হেমন্তের জোছনা বয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর বুক থেকে । মহাকালের ঘূর্ণিপাকে ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে কয়েক কোটি বছর থেকে । যখন আর্কিওপটেরিক্সরা উড়ে বেড়াত, ডাইনোসররা ছিল, ডেভোনিয়ান মাছেদের যুগ ছিলো । পৃথিবীর বয়স এভাবেই বেড়ে গেছে কালে কালে ।
সহস্র শতাব্দীতে জন্ম দেয়া আমাদের আদিপুরুষরা কোথাও হারিয়ে গেছেন । কিংবা বেঁচে আছেন এই জোছনার চারপাশে বিচরণ করা নক্ষত্রের মাঝে । অলৌকিকভাবে মাথার ভিতরে হাজির হওয়া কোনো সাইকিডেলিক সুর বেজে যাচ্ছে । কিছু মিশ্র শব্দ, কিছু মিশ্র আলাপন, কিছু মিশ্র সুর; হয়তোবা সেসব তাঁদেরই ।
পথে পথে জন্মানো কত লতাগুল্ম জন্ম নিয়েছে আবার হারিয়ে গেছে । মানুষের কাছে এসবের উপাত্ত ক’ বছরেরইবা আর্কাইভ করা আছে পুরোনো পুস্তকের পাতায় । এসবের শুমারি কি কখনও করেছে মানুষ । যাঁরা হারিয়ে যাচ্ছে । হৃদয় থেকে বিতাড়িত হওয়া মানুষগুলোর হিসেব, প্রেমে পড়ার হিসেব, ভালোবাসার হিসেব, বিরহ-বেদনার হিসেবের শুমারি কি হয়েছিল কখনও ।
প্রাচীন সেই আদিমতা আমাদের ভাবনাগুলো মসৃণ কতটুকুইবা করতে পেরেছে । শহরে শহরে জন্ম নেয়া তীব্র রূপসীদের হিসেব, কিংবা তাঁদের হারিয়ে যাবার হিসেব কি কখনও আজকের ক্যালকুলাসে উঠে এসেছে । এক ডারউইনীয় মতবাদ নিয়ে যতটা তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে পৃথিবীতে ।
শব্দ কম্পাংকের লেজারের মতো করে কত জোছনা ঝরে গেছে প্রতি পূর্ণিমাতে । চাঁদের বুড়োর সুতো কাটার সেই গল্প কিংবা বুড়ির ভাত রান্নার গল্প, চারপাশে অভুক্ত শিশুদের বসে থাকার গল্প আর কতদূর-ই নেবে মানুষকে । কতদূর এগুলো মানুষ ।
পাতালপুরের ঘুমে যেখানে মানুষ খুঁজে চলেছে অর্থ-প্রাচুর্য, প্রিয় সেই সুগন্ধি, প্রিয় সেই মুখ; যে-সকল সম্পর্ক, সম্বন্ধ কিংবা আবেশ মানুষ খুব সহজেই নিজের করে ভেবে নিতে পেরেছিল । অথচ স্বপ্নের তেপান্তরেও কত ফুল ফুটে গেছে আজও, নারীর জরায়ু থেকে আজও পৃথিবীতে এসেছে কত নব প্রাণ ।
জীবনের গল্প এভাবেই বেড়ে যেতে থাকে । মস্তিষ্কের কোষে কোষে ঢুকে পড়ে প্রতিদিনের ঘটনা । তারপর আবার আসে রাজনীতি । আসে বিদ্রোহের গল্প, ঝরে যাওয়া প্রাণের হিসেব । আর কত! পৃথিবী জুড়ে মানুষের না থাকা জুড়েওতো ঘটে গেছে কত রাজনীতি, সংঘর্ষ, যুদ্ধ ।
ক্রমে ক্রমে সারভাইভাল অব দি ফিটেস্টকে গ্রহণযোগ্য করে টিকে থাকতে থাকতে মানুষের বয়স দুই লক্ষ বছর । জনাকীর্ণ হয়ে কোনো মরুর বুকে মানুষের বয়স বেড়েছে । তবুও মানুষ হামাগুড়ি দিচ্ছে, হাটছে, ক্লান্ত হচ্ছে । মরুর পাশের সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝেও মাঝ ধরে চলছে ।
টিকে থাকতে থাকতেই মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে জীবনের এই অমসৃণ ত্বকের সাথে । নদীটা মরে যায়, পাহাড়টা সরে যায়, নৌকাগুলো ডুবে যায় সাঁঝের বেলায় । এভাবেইতো বৃদ্ধতরের পৃথিবীতে বয়োবৃদ্ধ মানুষের বয়স বাড়তেই থাকে বাড়তেই থাকে...
সাব্বির আহমেদ সাকিল
২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল | শুক্রবার | ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ইং | বগুড়া
Comments
Post a Comment