শৈশবের কিছু স্মৃতি!

 

তখন আমি কৈশোরে । আমাদের খেলার মাঠ ছিল আমার দাদার বাগানে । যেখানে একটাসময় সত্যিকারের শোভিত মনোমুগ্ধকর বাগান ছিল । দাদার পূর্বপুরুষরাও বোধহয় নেবুচাঁদ নেচার মতো ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান বানানোর খায়েশ ছিল । দাদার সেই বাগানের উত্তর-পশ্চিমে আছে বেশ কয়েকটি কবর, যাঁরা দাদার পূর্বপুরুষ এবং স্বজন । তখন আশেপাশে বাড়িঘরের সংখ্যাও ছিল খুব কম । 

আমাদের ক্রিকেট খেলার মাঠ বলতে ওটাই ছিল তখন । খেলার সময় বহুবার সেই কবরগুলোর ফাঁকে বল ঢুকে যেত । এভাবে বহু ক্রিকেট বল আমরা সেই কবরগুলোতে হারিয়ে ফেলেছি । গ্রামের একটা ছেলে ছিল খুব সাহসী । ওঁর পরিবার অনেক গরীব, বেশিরভাগ সময় ছেলেটার অনাহারে দিন কাটতো ।

আমাদের হারানো বলগুলো সে কবরের ভিতরে হাত দিয়ে বের করে আনতো । কখনও এমন হতো যে পনেরো-বিশটা বল একসাথে বের করেছে । একদিন হলো কি বল বের করতে গিয়ে হঠাৎ কঙ্কালের কিছু অংশ উঠে এলো, আমরা ভয়ে দৌঁড় । এরপর কয়েকজনের জ্বর শুরু হলো । ভয়ংকর জ্বর । 

বাড়িতে আমরা সেই ঘটনা ভয়ে বলিনি । অনেকেই সন্দেহ করেছিল আমরা বোধহয় আর বাঁচবোনা । ভয়টা মনের ভেতর এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে মানুষ দেখলেও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তাম । অতঃপর বেশকিছু দিন জ্বর থাকার পর সুস্থ্য হয়ে উঠি । 

আমাদের মধ্যে থেকে সেই ছেলেটার এরকম সাহসীকতার আবির্ভাব কিভাবে ঘটেছিল তা আমাকে ভীষণভাবে ভাবায় । 

এযাবৎকালে অনেকগুলো মানুষকে কবর দিয়েছি । কিছুদিন পূর্বেও একদিনে দু'টো মানুষ মারা গেলেন । যাঁদের সাথে ভালো সখ্যতা ছিল আমার । একজন পাড়াতো দাদী আরেকজন পাড়াতো ভাই । দাদী যখন দাদার সাথে হেঁটে হেঁটে রাস্তা দিয়ে যেতেন, দাদীকে বলতাম আমার হোন্ডাতে ওঠেন এগিয়ে দিই । দাদী ছিলেন ডায়বেটিস রোগী, স্থুল শরীর, বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত । উনি উঠতে পারতেননা, ঢুক ঢুক করে হেঁটে মেইন রাস্তায় যেতেন দাদার সাথে । দাদী মারা যাওয়ার পর দাদা আবারও একলা হয়ে গেলেন । 

যখন অনেক দেরীতে বাড়ি ফিরি দেখা যেত ওই পাড়াতো ভাই তাঁর কর্মস্থল থেকে ফিরছে, হোন্ডা থামিয়ে আমাকে নিয়ে আসতো । উনি একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন । অধিকাংশ সময় কোম্পানির টি-শার্ট পড়ে থাকতেন । আফসোস! মানুষগুলো আর নেই । 

আমার নানা যখন মারা যান তখন আমি সম্ভবত ক্লাস ফোরে পড়ি । নানাকে শোয়ানো হয়েছিল উত্তর-দক্ষিণ দিকে । নানাকে ঘিরে মামা-মামী, আত্নীয় স্বজনরা । কেউ মুখে পানি দিচ্ছেন, কেউবা দোয়া-দরুদ পড়তে বলছেন । কেউবা আবার পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন । নানার সারাটা জীবন ছিল নির্লোভ, নিরহংকারের সাদামাটা জীবন । 

নানা মারা গিয়েছিলেন পবিত্র অবস্থায় । নানা মারা যাওয়ার পর তাকে উঠোনে শুয়ে রাখা হয়েছিল । নানীর বাড়িতে একটা কাঠের টুলের উপর আমি আর আমার ছোটভাই বসেছিলাম । মা আমাদের জড়িয়ে কান্না করছিলেন, বলছিলেন তোমাদের নানাকে আর তোমরা পাবেনা । সেই যে নানা চলে গেলেন আর ফিরে এলেননা । 

বেশ কিছুকাল ধরে মানসিক বিষন্নতা এমনভাবে জাপটে ধরেছে যে সেটার থেকে বের হতে পারছিনা । নানা ধরনের চিন্তা-চেতনা মস্তিষ্কের কোষে ঘুরপাক খাচ্ছে । সামুতে আমাদের বগুড়ার মহাস্থানকে নিয়ে একটা লেখা পাঠানোর কথা থাকলেও সেটি করে উঠতে পারিনি । নিজের সাথে আত্ন সমর করতে করতে সবকিছুর যেন খেই হারিয়ে ফেলছি । কতগুলো রাত কেটে গেছে পেইন কিলার আর স্লিপিং পিলের উপর ভর করে ।

পৃথিবীতে কিছু সময় একান্তই নিজের হওয়া দরকার । একটা সময় ছিল যখন রেগুলার রেললাইনে বসে আমরা সাহিত্য, সংস্কৃতির আড্ডা দিয়েছি । আমাদের আলাদা আলাদা ধ্যানধারণাতে তুমুল বিতর্ক করেছি । তখন লেখাও যেন মসৃণ হতো, কবিতাও বেশ ঝাঁক বেঁধে চলে আসতো । 

জীবনের অনেক ঘটনা-ই আমাদের অবর্ণনীয় থেকে যায়, থেকে যাবে । যা লিখতে চাই, জানাতে চাই তা হয়তোবা পুরোপুরিভাবে কেউ তুলে ধরতে পারিনা, পারবোওনা । সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলে বোধহয় এসবও এভাবে উঠে আসতোনা । উঠে আসতোনা নানারকম ছবি, লেখা, ভিডিও । 

জীবনের বেশকিছু সুখ, দুঃখ, বেদনা, বাস্তবতার গল্পগুলো মানুষের মাঝে থেকে যাওয়া দরকার । আমরা না থাকি, গল্পগুলো অন্তত থাকুক, থেকে যাক কিছু রঙীন, ধূসর ও হারিয়ে যাবার গল্প...

সাব্বির আহমেদ সাকিল 
২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল | সোমবার | ১২ ডিসেম্বর ২০২২ ইং | আপন নীড়, বগুড়া

Comments

Popular posts from this blog

কবিতা | তুমি চলে যাবার পর

সংবাদমাধ্যমে দৈনদশা

কবিতা | এবং এখান থেকে