ভ্রমন অভিজ্ঞতা | মধ্যনগর, সুনামগঞ্জ
যেতে হবে সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলায় । চারিদিকে থৈ থৈ পানি, তাঁর মাঝে ছোট একটা দ্বীপ গড়ে উঠেছে । গড়ে উড়েছে লোকালয়, ব্যবসায়িক কেন্দ্র । প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রলারে করে পাড়ি দিতে হয়েছে সেই স্থানে পৌঁছুতে ।
পার হতে হবে গুনাই নদী, উবদাখালী নদী । খুব একটা স্রোতের প্রবাহ নেই নদীতে । নদীর দু’ধারে গড়ে উঠেছে বসতি । কিছু মাঝি নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরছে । জালে আটকা পড়ছে রুই, কাতলা, পাঙ্গাস, পুঁটিসহ নানারকম মাছ ।
ট্রলার চলছে । এপাশ-ওপাশ করে । ট্রলারের ছাদে বসে চারপাশ দেখছি । নতুন এক অপরিচিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে । ট্রলার কয়েকটি লোকালয়ে স্টপেজ দিলো ।কেশপপুর থেকে এক বয়োজ্যেষ্ঠ লোক উঠলেন । আমাদের পাশেই বসলেন ।
যেতে যেতে পরিবারের মানুষদের সাথে কথা হচ্ছিলো ফোনে । উনি নোটিশ করতেছিলেন আমার কথাগুলো । মাঝেমধ্যে মাথা ঝাঁকাচ্ছিলেন । কথা শেষ করে বললাম, আঙ্কেল এপাশে বসেন । দু’জনে গল্প শুরু করলাম, উনার নাম নুরুল ইসলাম । ঈশপপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী হেড মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন । একুশ সালের শেষের দিকে রিটায়ার করেছেন ।
চার মেয়ে এক ছেলে । দু'জন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন । আর তিনজন পড়াশোনা করে । ঈদ উল ফিতরে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন । সেখানে মেয়ের ঝামেলা চলছে, জামাইয়ের অন্য একজায়গায় অ্যাফেয়ার ছিল । কিন্তু বিয়ের আগে সেটা গোপন করে বিয়ে করেছিলো । জামাই প্রাইভেট একটা ইউনিভার্সিটিতে প্রশাসনিক ভবনে চাকরি করে ।
করুণ সুরে আক্ষেপের সাথেই কথাগুলো বলছিলেন ।
জানিনা কেন মানুষ এত তাড়াতাড়ি আপন হয়ে যায়, আবার কেন এত তাড়াতাড়ি পর হয়ে যায়; পৃথিবীটা বড় বেশীই অদ্ভুতুড়ে!
মধ্যনগরে ধান বিক্রি করবেন বলে সেখানে ধানের স্যাম্পল নিয়ে যাচ্ছেন । আমিও আমার নিজের সম্পর্কে কিছু কথা বললাম । বললাম, আপনি শিক্ষিত, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ অথচ আপনি এরকম সিদ্ধান্ত কিভাবে নিয়েছিলেন । উনি ভীমড়ি খেয়ে গেলেন । বললেন, কি যেন এক তালে পড়ে তড়িঘড়ি করে এরকম একটা ঘটনা ঘটে গেলো ।
আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বিয়ে করেছি কি-না । প্রতিউত্তরে বললাম, আমি সন্ন্যাসী মানুষ, সংসার বৈরাগ্য আমাকে টানে, নিঃসঙ্গতা ভালো লাগে । হেসে দিলেন আমার কথা শুনে । বললাম, মনের মিলন ছাড়া কি আর বিয়ে হয় বলেন । কথা প্রসঙ্গে বললাম, কখনও কাউকে ভালোবেসেছিলেন, সহসাই উত্তর দিলেন । যে কেউ একজন নারী ছিলো, কিন্তু তাঁর সাথে বিয়ে হয়ে ওঠেনি ।
নানানরকম খেজুরে আলাপ চললো । মাঝপথে ট্রলার বন্ধ হয়ে গেলো, ঘণ্টাখানেক পর আরেকটা ট্রলার এসে নামিয়ে দিলো মধ্যনগরে । চারিদিকে পানি আর পানি, মাঝখানে একটা দ্বীপ ।
কাজ শেষ করে খাঁ খাঁ রোদের মাঝে আবার বন্দরে এসে ট্রলারে উঠলাম । পৌঁছুতে পৌঁছুতে বিকেল গড়িয়ে গেলো । ট্রলারের উপরে বসে গোধূলিলগ্ন কেটে গেলো । সূর্য আস্তে আস্তে গাঢ় লাল হয়ে গেলো । সারি সারি পাখিরা উড়ে যাচ্ছিলো । শালিক, পানকৌড়ি, বক দলবেঁধে গমন করছিলো ।
তারপর আবারও গন্তব্যে এসে ট্রলার থেমে গেলো । সমাপ্ত হলো এক মহাকালের যাত্রা...
সাব্বির আহমেদ সাকিল
০২ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, বর্ষাকাল | বুধবার | ১৭ আগস্ট ২০২২ ইং | মধ্যনগর, সুনামগঞ্জ
#ভ্রমণ #অভিজ্ঞতা #সুনামগঞ্জ #মধ্যনগর #দ্বীপ #নেত্রকোনা
Comments
Post a Comment