জীবনধারা
***জীবনের ধারাবাহিকতা এবং সমাজ কাঠামো নিয়ে একটি বিস্তারিত খাজুরে আলাপ***
জীবন মানে হলো ধাপ । জীবন মানে হলো সিঁড়ি । আপনি দাঁড়িয়ে উপরে উঠতে থাকবেন এক-পা দু-পা করে, খানিকটা বিশ্রাম নিবেন তারপর আবার উঠবেন । একটা স্টেপ ওঠার পর অন্য স্টেপে পৌঁছানোর জন্য হয়তোবা আপনার খানিকটা সময় লাগবে । অন্যদের মত যে আপনিও তড়িঘড়ি করে লক্ষ্য পৌঁছাতে পারবেন এমনটা নয় । অন্যদের হয়ত স্ট্যামিনা ভালো যে কারণে খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারে, কিন্তু আপনাকে স্রষ্টা যা দিয়েছে সেটাকে মেনে নিয়ে আপনাকেও এগুতে হবে । আপনি পারবেন-ই আপনি এগুবেনই । কেউ আশা, ভরসা, স্বপ্ন না দেখালেও বা আপনার পিছনে কোনো ব্যাকআপ না থাকলেও । আপনি আপনার মত বড় হচ্ছেন আর অন্যরা অন্যদের মত । আপনার কাছে আপনি অনন্য, অতুলনীয়, সঠিক ।
জীবনে সফলতা বা বিফলতা বলতে আমার কাছে অন্যকিছু মনে হয় । কোনটাতে সফলতা বা কোনটাতে বিফলতা তা আপনার মন যদি আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারে তবে আমি বলবো আপনি তখনই সফল । সফলতা মানে এই নয় যে কেউ সিক্স ডিজিটের স্যালারির বেতনে চাকরি করছে আর অন্যদিকে আপনি সামান্য কুড়ি হাজারের বেতনে চাকরি করছেন । খোঁজ নিয়ে দেখেন সে সেই সিক্স ডিজিটের স্যালারি পেয়েও হয়ত সুখী নয় ।
অথচ অন্যদিকে আপনার কুড়ি হাজার টাকার বেতনের চাকরি । মাসে মাসে বাসাভাড়া, গ্যাসবিল, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, বউয়ের জন্য এক্সট্রা কিছু এই নিয়েই আপনার পরিবার । তবুও আপনি এই বেতনেই সুখী । সকালে আপনার বউ খুব যত্ন করে রান্না করে দিচ্ছে, আপনিও হয়ত কোনদিন পাশে থেকে সাহায্য করছেন । অফিস থেকে ফিরে সে হয়ত তার ওড়না দিয়ে আপনার ঘাম মুছে দিচ্ছে । অফিস থেকে ফেরার সময় ছেলেটার জন্য দোকান থেকে একটা চকলেটের প্যাক আনলেন । ব্যাস, এই নিয়েই আপনার জীবন । যদিও আপনার ফ্যামিলিতে অনেক টানাপোড়ন তবুও আপনি সুখী । আপনি একটি সাধারণ জীবন লিড করছেন ।
যদি উপরের দিকে চোখ দেন দেখবেন আপনি যে টানাপোড়নের ভিতর থেকেও যে সুখটাকে খুঁজে পাচ্ছেন, আপনার উপর লেভেলের লোকটা তার ধারেকাছেও যেতে পারছেনা । সবার কাছে জীবনের মানেটা আলাদা, ঠিক তেমনি আপনার কাছেও আপনার জীবনের মানেটা আলাদা ।
ভাগ্য এবং পরিশ্রমের কথাই ধরুননা কেন । পরিশ্রমকে একটা বড়শি হিসেবে কল্পনা করুন এবং জলের ভিতর থাকা মাছকে(যে কোন প্রকারের হতে পারে) সফলতা হিসেবে কল্পনা করুন । আপনি এবং আপনার বন্ধু একসাথে মাছ ধরতে গেলেন পুকুরে । পুকুরে অনেক মাছ । ধৈর্যময় একটি কাজের তালিকায় বড়শি দিয়ে মাছ ধরাটা বোধহয় বেশ উপরে । কারণ এখানে অসীম ধৈর্য্যর পরিচয় দিতে হয় । দুই বন্ধুই ধৈর্য্যর পরিচয় দিচ্ছেন । বড় একটা মাছ তোলার চেষ্টা করছেন । আপনার চিন্তাধারা জুড়েই আছে যে অবশ্যই বড় মাছ তুলতে হবে । আপনি কিন্তু পুকুরের একটা ছোট টাইপের সিলভার অথবা তেলাপিয়াও কল্পনা করতে পারেন, তা আপনি করেননি কারণ আপনার আকাঙ্খাটাও বড় । আর তাছাড়া বড় মাছটা তুলতে পারলে বাড়ির সবাই খুশি আর আপনিতো আনন্দে আত্নহারা হয়ে সেইটা নিয়েই দৌঁড় দিবেন ।
যথারীতি দুজনেই ধৈর্য সহকারে বড়শিটা পানিতে ধরে আছেন । আপনার পাশের বন্ধুটা হুট করেই একটা বড় রকমের মাছ পেয়ে গেলো এবং সে উল্লাস করতে থাকলো । কারণ আপনার বড়শিতে আপনি এখনও একটা পুঁটিও তুলতে পারেননি । সে আপনাকে টিটকারি করবে, আর এটাই স্বাভাবিক । এটাই হয়, সামাজিক নিয়ম এটাকেই বলে । আপনার বন্ধুটা সেই বড় মাছটা পেয়ে বাড়িতে চলে গেলো । অথচ আপনি বসে আছেন, মাছ ধরতে এসেছেন মাছ তো ধরতেই হবে । আর পুকুরেও অনেক মাছ আছে সেহেতু ভরসাটাও আছে মনের ভিতর । কিছুক্ষণ পর আপনার বড়শিতেও মাছ উঠলো একটা ছোট আকারের থাই সরপুঁটি । আপনি এতে সন্তুষ্ট হতে পারলেননা, আপনি সেই আপনার বন্ধুর চিন্তাটা ভর করে বসে আছেন সে এতবড় একটা মাছ ধরতে পারলো অথচ আপনার ভাগ্যে এত ছোট একটা মাছ । বসে আছেন... কিছুক্ষণ পরে আরেকটা মাছ উঠলো । তবে এবার আর সরপুঁটি নয় বরং একটা তেলাপিয়া উঠলো । এবারও আপনি খুশি নন, কারণ আপনাকে আপনার বন্ধুর মত বড় একটা কাতলা ধরতে হবে । আর আপনি সেই কাতলাটাকে ঘাড়ে করে নিয়ে অন্যদের দেখাতে দেখাতে বাড়িতে যাবেন । তারপর আপনার বাড়ির মানুষজন বেশ হৈ হুল্লোড় শুরু করবে ।
আপনি বসে আছেন...ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে সূর্যটা হেলে পড়ছে । মাথার উপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি তাদের নীড়ে পৌঁছাচ্ছে । আপনি আশা নিয়ে বসেই আছেন বড়শি ফেলে । কিছুক্ষণ পরে আরেকটা ছোট আকারের মাছ উঠলো । আপনি এবারও সন্তুষ্ট নন ।
ওদিকে খেয়াল করে দেখলেন আপনার বন্ধুটা খুশির তুখোড়ে তার বড়শিটা ফেলে গেছে । আপনি আপনার সেই তিনটা মাছ আর আপনার বড়শিটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন । আপনার মন খারাপ আপনার বন্ধুর সেই মাছের কথাটা ভেবে । বাড়িতে এসে ফ্যামিলি মেম্বারদের মাছ দেখালেন তারা আপনার এই ছোট তিনটা মাছ দেখে তারাও খুশি নয় । আপনি তাদের গল্প শোনাচ্ছেন, আপনার সেই বন্ধুটার ।
পরিশ্রম, কষ্ট, ধৈর্য কিন্তু দুজনেই ধরেছিলেন । কিন্তু আপনার ভাগ্যে কি জুটলো? পরিশ্রম আর কষ্ট করলেই কি সব মেলে? আপনার কাছে হয়তোবা মিলতেও পারে! অন্যর কারে সেইটা নাও হতে পারে । কারণ তার হয়তোবা দেখার ধরণটা ভিন্ন!
হ্যাঁ আপনার ভাগ্যও জুটেছে । খুব বড় না হলেও চলার মত, খাওয়ার মত একটা অবস্থা হয়েছে । একবার "আলহামদুলিল্লাহ্" পাঠ করুন মনে মনে ।
আপনি আবার আগামিকাল যাবেন বড় মাছের লোভে । আপনাকে বড় মাছটা ধরতেই হবে । ধরুন সে যে মাছটা ধরেছে সে যদি ঐটাকে পাশে রেখে আবার বড়শিটা ফেলত তবে গতবারের থেকে আরও বড় মাছে পেত । অথচ সে কি করলো! বা একবারও কি ভেবে দেখেছেন আপনার সেই বন্ধুটার থেকেও বড় একটা মাছ আপনার বড়শিতে উঠলো কিন্তু আপনি সেটাকে তীরে তোলার আগে সেইটা আপনার বড়শির সুতোটা সহ চলে গেলো । লাভটা কি হলো? ফলটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো?
তারচেয়ে বরং আপনি প্রতিদিন দুটো-তিনটা মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতেন এবং বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে খেতেন । কিন্তু আপনি তা করেননি । হয়তোবা এই সমাজের কাছে সেইটা করাও উচিত নয় । সে নিয়ম সমাজ আপনাকে শেখায়নি, আপনাকে তাদের মত করে গড়তে হবে ।
নিজেকে মানুষ হিসেবে কল্পনা না করে বরং একটা যন্ত্রচালিত রোবট হিসেবে কল্পনা করুন । কারণ এখানে আপনাকে অন্যদের কমান্ড অনুযায়ী আপনাকে চলতে হয়, মানতে হয় । এক যুগ-দুই যুগ-চার যুগ-আট যুগ ধারাটা চলতেই থাকে ।
ধরুন আপনি একটা লক্ষ্য পৌঁছানোর জন্য খুব মরিয়া । আপনাকে সেখানে পৌঁছতেই হবে । আপনি যখন ঐ লক্ষ্য পৌঁছে গেলেন তখন বৈষম্য কাকে বলে তখন বুঝবেন । যখন দেখবেন আপনার লক্ষ্য থেকে আপনার পাশের জনের লক্ষ্যর স্থানটা বড় । সে আপনার থেকে ভালো পজিশনে আছে, আপনার থেকে থেকে তার স্যালারি ভালো তার ক্যারিয়ার গঠন আপনার থেকে আলাদা । অথচ আপনি মনে মনে ভেবেছিলেন আপনার যে লক্ষ্য সেটাতে পৌঁছাতে পারলে আপনাকে কেউ আর আঙ্গুল তুলতে পারবেনা । কেউ আর আপনাকে অর্ডার করতে পারবেনা । কেউ আপনাকে শোষণ করতে পারবেনা । আপনার লেভেল, স্যালারি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেনা । অথচ...অথচ তখন আপনার ঘোরগুলো আস্তে আস্তে কাটতে থাকবে । বিসিএস ক্যাডার হোন বা এফপিপিএস করা ডাক্তার তখনও দেখবেন বৈষম্য চলে আসতেছে । আপনি আপনার মনকে তখন কোনোকিছুতেই শান্তনা দিতে পারবেননা । আপনার তখন মনে হবে, ইশ! এর থেকে যদি আরেকটু বড় হতে পারতাম । আরেকটু বড় লেভেলে পৌঁছাতে পারতাম । হঠাৎ করে আপনি হয়ত সেই লেভেলেও পৌঁছে গেলেন তারপর দেখলেন সেই সেইম কেস । সেখানেও বৈষম্য, সেখানেও মানুষ আপনাকে কথা শোনাচ্ছে । আপনার থেকে সেখানে আরো বড় বড় লোক আছে । অথচ আপনি...
হায়! হায়! করেই আমরা যেন একটা পুরো জীবন শেষ করে দিই । কখনও নিজেক প্রশ্নও করিনা বা তার উত্তরও করিনা । কখনওকি নিজেকে বলেছি, "এনাফ! ঈটস এনাফ । আই হ্যাভ এনাফ । আমার যথেষ্ট আছে আমার আর প্রয়োজন নেই ।" না করিনি । করবোওনা হয়তোবা কখনো, কারণ সমাজে আমাদের এইটা শেখায়নি । সমাজ কখনও নিস্তার দেয়নি এতটা পথ হেঁটে আসার পরও, এত কষ্ট, পরিশ্রম, দুঃখ-দুর্দশা, লাঞ্চনা-বঞ্চনা সহ্য করার পরও ।
সমাজ হলো একটা সদ্য বাচ্চা দেয়া একটা গাভী । যেই গাভীর দুধের নিপলে হাত দিতে গেলেই লাত্থি মারে । আর সেই লাথিতে আপনার দাঁত ভাঙতে পারে, আপনার চোয়াল ফাটতে পারে । বা এমনও লাথি দিতে পারে যে লাথিটা আপনার বুকের বাঁ পাশে সজোরে লাত্থি দিয়ে আপনার কলজেটা ফেটে দিবে । আর আপনি যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে মারা যাবেন ।
এভাবেই মারা যাবেন । আপনি, আমি সবাই । কেউ গাভীর দুধে হাত দিয়ে দুধপান করে মরবে, কেউবা দুধে হাত দেওয়ার সাহসটাও পাবেনা । কেউবা দূর থেকে চোখ দিয়ে দেখবে আর গাভীটার এতবড় দুধ দেখে চোখ বন্ধ করে ঠোঁট চটকাবে । মনে মনে দুধ খাওয়ার ফিল নিবে ।
এভাবেই চলতে থাকবে...এটাই নিয়ম । আপনি আমি এভাবেই চলতে থাকবো । থাকতে থাকতে একসময় মুখ থুবড়ে পড়বো, যেখান থেকে ওঠার আর কোনো শক্তি থাকবেনা আমাদের । থাকবেনা কোনো লোকবল, থাকবেনা কোনো প্রেরণা দেওয়ার লোক, থাকবেনা কোনো ব্যাকআপ!!!
(নোট : আমার ভাবনা অনুযায়ী লিখেছি । আপনি আমার ভাবনাকে কিভাবে নিবেন- না নিবেন তা আপনার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় । ভুলক্রটি মার্জনীয় ।)
-সাব্বির আহমেদ(আলোহীন ল্যাম্পপোস্ট)
২৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | শুক্রবার | সকাল ৯ টা ৪৫ মিনিট
Comments
Post a Comment