পৃথিবীতে আমি কি একটু শিউলির গন্ধ পেতে পারি?
সারাদিনের ক্লান্তি শেষে, ক্যাজব্যাজ, গাড়ির হর্ন, বসের বকাঝকা শেষে রাতের নিস্তব্ধতা আর হিমেল হাওয়ার মাঝে দূর পাহাড়কে লক্ষ্য করে বসে থাকি । ভাবতে বসি । সিগারেট ফুঁকি । সারাদিন রাজনৈতিক আলাপন, মিছিল, সমালোচনা, মিথ্যা আলাপ, মারপিট নানা ইস্যু ভেসে আসে ফেসবুকের পাতায় ।
সময় কেটে যায় দুই আঙ্গুলের ফাঁকে । দু-চারজন(পরিবারের সদস্য, বন্ধু) ছাড়া তেমন কারোর সাথে কথা হয়না । মাসখানেক আগে মা বললেন, আমার জন্মদিনে লাগানো পেয়ারা গাছের পেয়ারা বড় হয়ে গেছে । ছোটবোন পেয়ারা খাচ্ছে । সে পেয়ারা ভালোবাসে । সাতমাথা গেলে বাটা শোরুমের পাশে, সেন্স বেরীর পাশে, সপ্তপদী মার্কেটের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে বসা পেয়ারা বিক্রেতা দেখলেই ছোট বোনের কথা মনে পড়ে, সামান্য কিছু পেয়ার কিনে নিয়ে যাই ।
মা ছোট ছোট মিষ্টি(হাসিখুশি মিষ্টি) পছন্দ করেন । আকবরিয়া, শ্যামলী হোটেলের পাশে সুসজ্জিত থাকে ছোট ছোট মিষ্টির পসরা । ঈদের ছুটিতে দু-তিন দিন শহর তন্নতন্ন করে খুঁজেও ছোট মিষ্টি খুঁজে পাইনি । আক্ষেপ কাজ করেছে, ক্ষোভ কাজ করেছে । ফলের মধ্যে আম আর আতা ফল পছন্দ করেন, যতটা পারি চেষ্টা করি সামান্য কিছু নিয়ে যেতে । আব্বা পান খান, বাজার থেকে ভালো মানের পান কিনে নিয়ে যাই ।
পকেটে থাকা মানিব্যাগ শূন্য হতে থাকে । বন্ধুদের কাছে ধার করা লোনের বোঝা বাড়তে থাকে । জীবন ও জীবিকার সাথে আয়-ব্যয়ের তাল মেলেনা । অটোওয়ালার সাথে বাক-বিতন্ডা করে চলতে হয়, লোকাল বাসের হেলপারের সাথে বাক-বিতন্ডা করে চলতে হয় । হরহামেশাই নিজেকে অসহায় মনে হয়, সমুদ্রের মাঝে ভেসে থাকা এক টুকরো জামগাছের কাঠের টুকরোর মতো ।
শূন্য মানিব্যাগ নিয়ে জীবনকে ভাবতে থাকি । বয়স বেড়ে যায় । সোনালী যৌবন পোড় খেয়ে যায় সমাজ-সামাজিকতায় । মৃত্যুর আগে কাজল চোখের মেয়েটির কথা ড্রাগসের মধ্যে মাথায় বসে থাকে ।
আজও প্রতি শুক্র ও সোমবারে হাট বসে । সাইফুল মামা, মোহাম্মদ দুলাভাই, রব্বানী ভাই বনানী হাটে বেচা-কেনা শেষে সাইকেল, ভ্যান নিয়ে বাড়ি ফেরেন টর্চলাইট নিয়ে ।
গতবছর এই সময়গুলো আমার রাজধানীতে কেটেছে । রবীন্দ্র sorrowবরে, মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে, ধানমন্ডি রোডে কেটে গেছে । বড় বড় নগরীর বুকে বড় বড় ব্যথায় সময় কেটে গেছে ।
পৃথিবীর বয়স বেড়ে যাচ্ছে । আদ, সামুদ, মেসোপটোমিয়া সভ্যতারা বিলুপ্ত হয়ে গেলো । মানুষের তৈরি আইনের মতো কোনো গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা তাঁদের গুম হতে হয়নি । স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই গুম করে দিয়েছেন ।
ভিটেমাটিতে লাগানো সেই শিউলি গাছে এখনও প্রতি বছর শিউলি ফোঁটে । সকাল বেলা শিশিরের সাথে প্রেমে মেতে ওঠে । একটা সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ রুমে সুয়ে থাকি, আমার নাকে লাগানো অক্সিজেন টিউব খুলে দিতে বলি শিউলির গন্ধ নেবো বলে । কম বয়সী নার্স বলে ওঠেন, এটা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট । খুলে দিলে আপনি আর বাঁচতে পারবেননা!
সাব্বির আহমেদ সাকিল
০১ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল | মঙ্গলবার | ১৬ আগস্ট ২০২২ ইং | কলমাকান্দা, নেত্রকোনা
Comments
Post a Comment